মডিউল 3 / 10

ফিয়াট মানি কী?

3.0 ভূমিকা

মানবজাতির ইতিহাস মানে টাকার মূল্য কমে যাওয়ার ইতিহাস।
মিল্টন ফ্রিডম্যান

আমরা আগের মডিউলে দেখেছি কীভাবে টাকা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং কীভাবে আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী টাকা থেকে দুর্বল টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা আজকের পৃথিবীকে গড়ে তুলেছে। এই মডিউলটি আরও গভীরে গিয়ে দেখাবে কীভাবে এই পরিবর্তনগুলো আজকের ফিয়াট ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে এবং এই ফিয়াট ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে।

তাহলে আজ আমরা যে ফিয়াট ব্যবস্থা ব্যবহার করি, সেটি কীভাবে তৈরি হলো?

এটি বুঝতে হলে আমাদের মার্কিন ডলারের দিকে তাকাতে হবে। আজকের দিনে, ডলার বিশ্বব্যাপী প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ অনেক দেশ বাণিজ্য, সঞ্চয় এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি ব্যবহার করে। এই কারণে, মার্কিন ডলার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

আপনার দেশে টাকা কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে, যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক ফিয়াট ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠেছে তা জানা সহায়ক।

3.1 ফিয়াট অর্থের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৮১৫-১৯৩৩ ১৯১৩ ১৯৩৩ ১৯৩৪ ১৯৪৪ ১৯৭১ ১৯৮০
স্বর্ণ মানদণ্ড “The Federal Reserve” প্রতিষ্ঠা এক্সিকিউটিভ অর্ডার ৬১০২ গোল্ড রিজার্ভ আইন ব্রেটন উডস চুক্তি নিক্সন শক টাকার ৯৬% মূল্য হারিয়েছে

উনবিংশ শতকে, অনেক সমাজ মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা ও রূপার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী অর্থব্যবস্থা ব্যবহার করত। এই ধাতুগুলো মূল্যবান ছিল কারণ এগুলো ছিল দুষ্প্রাপ্য, টেকসই এবং সর্বজনস্বীকৃত। বাণিজ্য বাড়ার সাথে সাথে, বড় পরিমাণে ধাতু বহন করা অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে। তখন ব্যাংকগুলো মানুষের জন্য সোনা ও রূপা সংরক্ষণ করতে শুরু করে এবং সেই জমাকৃত ধাতুর নির্দিষ্ট পরিমাণের প্রতিনিধিত্বকারী কাগজের সার্টিফিকেট ইস্যু করত।

সময়ের সাথে সাথে, ব্যাংকগুলো তাদের কাছে থাকা সোনার চেয়ে বেশি কাগজের সার্টিফিকেট ইস্যু করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াটি, যা পরিচিত আংশিক রিজার্ভ ব্যাংকিং নামে, এতে ব্যাংক দৌড়ের ঝুঁকি তৈরি হয়, যেখানে অনেক মানুষ একসাথে তাদের সোনা তুলতে চায়। ব্যাংকিং ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে, সরকার আরও বেশি হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে।

১৯১৩ সালে, যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করে The Federal Reserve, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা নতুন টাকা ইস্যু করতে এবং সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করতে পারে।

১৯৩০-এর দশকে, মার্কিন সরকার নাগরিকদের তাদের সোনা জমা দিয়ে কাগজের ডলার নিতে বাধ্য করে। এর কিছুদিন পর, সরকার ডলারের মান সোনার তুলনায় কমিয়ে দেয়, যার ফলে মানুষের সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

Executive Order 6102

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, ব্রেটন উডস ব্যবস্থায় বৈশ্বিক মুদ্রাগুলোকে মার্কিন ডলারের সাথে যুক্ত করা হয়, এবং ডলার তখনও সোনার বিনিময়ে আদান-প্রদান করা যেত। ১৯৭১ সালে এই ব্যবস্থা শেষ হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে সোনার সাথে বিনিময়যোগ্য রাখা বন্ধ করে দেয়। তখন থেকে, বেশিরভাগ দেশ ফিয়াট মানি ব্যবহার করে।

ফিয়াট মানি হলো এমন মুদ্রা যা সোনা বা অন্য কোনো বাস্তব সম্পদের দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং, এর মূল্য আছে কারণ সরকার এটিকে বৈধ মুদ্রা ঘোষণা করে এবং মানুষ এটি গ্রহণ ও বিশ্বাস করে।

3.2 ফিয়াট সিস্টেম

প্রচলিত মুদ্রার মূল সমস্যা হলো এটি কার্যকর করতে যে পরিমাণ বিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশ্বাস করতে হয় যে তারা মুদ্রার মান কমাবে না, কিন্তু ফিয়াট মুদ্রার ইতিহাসে সেই বিশ্বাস ভঙ্গের বহু উদাহরণ রয়েছে।
Satoshi Nakamoto

মানবজাতি এমন এক অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে অনেকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী অর্থ থেকে কয়েকজনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দুর্বল অর্থে চলে গেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা আসলে কীভাবে কাজ করে?

একটি ফরমানভিত্তিক অর্থব্যবস্থা

ফিয়াট ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হলো এর বাধ্যতামূলকতা, যা আইনত বাধ্যতামূলক মুদ্রা আইন দ্বারা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ল্যাটিন শব্দ 'ফিয়াট' অর্থ "ফরমান দ্বারা" এবং এটি কোনো কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনার প্রতি ইঙ্গিত করে।

সোনা বা অন্য কোনো বাস্তব সম্পদ দ্বারা সমর্থিত অর্থের বিপরীতে, ফিয়াট মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হয় এর জোরপূর্বক একচেটিয়া অবস্থান এবং জনগণের আর্থিক ও মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসের মাধ্যমে। এই অর্থে, ফিয়াট অর্থকে একটি কনসার্ট টিকিটের সাথে তুলনা করা যায়: এর মূল্য কাগজের টিকিটে নয়, বরং এই আশ্বাসে যে ব্যান্ড (সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক) একটি চমৎকার অনুষ্ঠান (অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা) দেবে।

সব প্রধান মুদ্রা যেমন টাকা, ইউরো, পাউন্ড, ইউয়ান, পেসো এবং অন্যান্য ফিয়াট অর্থের অন্তর্ভুক্ত।

আইনত বাধ্যতামূলক মুদ্রা: একটি আইন যা সকল নাগরিককে নির্দিষ্ট ধরনের মুদ্রা গ্রহণ করতে বাধ্য করে।

ফিয়াট অর্থের সুবিধা
  • ব্যবহারে সহজতা: ফিয়াট অর্থ দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য সুবিধাজনক।
  • কম খরচ ও ঝুঁকি: ফিয়াট অর্থের জন্য সোনার মতো ভারী নিরাপত্তার প্রয়োজন হয় না, তাই এটি সস্তা ও নিরাপদ।
ফিয়াট অর্থের অসুবিধা
  • মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি: সরকার ইচ্ছেমতো ফিয়াট অর্থ ছাপাতে পারে, ফলে মুদ্রার মান কমে যায় এবং মূল্য বৃদ্ধি পায়, যার ফলে সঞ্চয়কারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ইতিহাসে কিছু ক্ষেত্রে, এই ধরনের অপব্যবহার চরম মুদ্রাস্ফীতির কারণ হয়েছে।
  • কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ও কারসাজি: ছোট একটি গোষ্ঠী ব্যবস্থা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যার ফলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তির ঘটনা ঘটে।
  • প্রতিপক্ষের ঝুঁকি: যদি সরকার সমস্যায় পড়ে এবং জনগণ বিশ্বাস হারায়, তাহলে মুদ্রার মান কমে যেতে পারে।

ফিয়াট মুদ্রার আগের যুগে, সরকারগুলো মূল্যবান ও দুর্লভ পদার্থ যেমন সোনা বা রূপা দিয়ে মুদ্রা তৈরি করত, অথবা এমন কাগজের টাকা ছাপাত যা নির্দিষ্ট পরিমাণ ঐসব পদার্থের বিনিময়ে আদান-প্রদান করা যেত। এটিকে পণ্য-সমর্থিত ব্যবস্থা বলা হয়।

ফিয়াট ব্যবস্থায়, এটি অনেকটা মনোপলি গেমের টাকার মতো। ফিয়াট অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত কাগজ, যার মূল্য নির্ধারিত হয় সরকারি নীতির দ্বারা। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনোপলি গেমের "ব্যাংকার"-এর মতো: তারা নিয়ন্ত্রণ করে কে কী পাবে, এবং টাকার মূল্য কত হবে। অর্থাৎ, ফিয়াট অর্থের মূল্য নির্ভর করে সরকারের ওপর বিশ্বাসের ওপর, যে তারা দায়িত্বশীলভাবে অর্থব্যবস্থা পরিচালনা করবে।

ফিয়াট ব্যবস্থা একটি বিশ্বাসের খেলা, যেখানে আমাদের টাকার মূল্য নির্ভর করে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের প্রতিশ্রুতির ওপর এবং মানুষ কেবল আশা করতে পারে যে তাদের সরকার সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করবে।

ঋণনির্ভর একটি ব্যবস্থা

এটা ভালোই হয়েছে যে দেশের মানুষ আমাদের ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থা বোঝে না, কারণ তারা যদি বুঝত, আমি বিশ্বাস করি আগামীকাল সকাল হবার আগেই একটা বিপ্লব হয়ে যেত।
Henry Ford

আংশিক রিজার্ভ ব্যাংকিং ফিয়াট ব্যবস্থার একটি মূল উপাদান। এর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলো আইনত তাদের গ্রাহকদের আমানতের একটি বড় অংশ ঋণ দিতে পারে, ফলে যেকোনো সময়ে ব্যাংক আসলে গ্রাহকদের জমা রাখা অর্থের খুব সামান্য অংশই হাতে রাখে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন কেন ব্যাংকগুলো শুধু আমানত রাখার বাইরে এত সেবা দেয়? এটা উদারতা মনে হলেও, মনে রাখা জরুরি যে ব্যাংক হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা করা। কিন্তু তারা যদি মানুষকে ঋণ দেয়, তাহলে কীভাবে মুনাফা করে?

ব্যাংক বিভিন্নভাবে আয় করে
  • তারা ঋণে সুদ নেয়।
  • এটিএম ব্যবহার ও অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণের মতো সেবার জন্য ফি নেয়।
  • বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে, যেমন শেয়ার কেনাবেচা বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ।
  • ঋণের একটি অংশ রিজার্ভে রেখে বাকি অংশ বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়।
  • জমার ওপর সুদ দেয় এবং চেকিং ও সেভিংস অ্যাকাউন্টে ফি নেয়।
  • একটি ব্যাংক আমানত পেলে, তাদের কেবল একটি অংশ (রিজার্ভ প্রয়োজনীয়তা) ধরে রাখতে হয় এবং বাকি অংশ ঋণ দিতে পারে।

এই প্রক্রিয়ার ফলে ঋণনির্ভর অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠে, কারণ ব্যাংক প্রতিটি ঋণের মাধ্যমে নতুন মুদ্রা তৈরি করে, ফলে মোট অর্থের পরিমাণ বাড়ে। আংশিক রিজার্ভ ব্যাংকিং চলতে থাকলে, অর্থনীতিতে মোট ঋণের পরিমাণ বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এই ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে ঋণের মাধ্যমে নতুন মুদ্রা তৈরির ওপর নির্ভরশীল, যা একজন আসক্তের জন্য নিয়মিত মাদকের মতো: সবাই খেলায় থাকলে, বিভ্রম বজায় থাকে। কিন্তু ব্যাংকগুলো যদি অতিরিক্ত লোভী হয়ে পড়ে এবং মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।

এখানেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক শেষ আশ্রয়দাতা হিসেবে আসে, নতুন মুদ্রা সরবরাহ করে ব্যাংক পতন ঠেকাতে এবং বিভ্রম বজায় রাখতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি করে সম্পদ পুনঃক্রয় বা সরাসরি ব্যাংকের হিসাবে মুদ্রা ঢুকিয়ে। মূলত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রমাগত নতুন মুদ্রা প্রবাহের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পতন থেকে রক্ষা করা হয়, যার ফলে অর্থনীতিতে উত্থান-পতনের চক্র চলে।

  1. ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নেয় (ধরা যাক ৫%)
  2. ব্যাংক এই টাকা ঋণগ্রহীতাদের কাছে বেশি সুদে ধার দেয় (ধরা যাক ৯%)
  3. ব্যাংক ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদ থেকে আমানতের সুদ দেয় (৯% - ৫% = ৪%) এবং বাকি অংশ লাভ হিসেবে রাখে
ব্যাংক কীভাবে টাকা তৈরি করে

বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময় নতুন ফিয়াট অর্থ তৈরি করে।

  1. উত্থান
    • ব্যাংক নতুন ঋণ তৈরি করলে অর্থের সরবরাহ বাড়ে
    • মানুষ এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আরও বেশি ঋণ নেয় এবং খরচ বাড়ায়
    • চাহিদা বাড়ে এবং দাম বেড়ে যায়
    • বিনিয়োগ বাড়ে, প্রায়ই বাস্তব অর্থনীতির সামর্থ্যের চেয়ে বেশি
  2. মন্দা
    • চাহিদা কমে যায় এবং বিনিয়োগ ব্যর্থ হতে শুরু করে
    • সম্পদের দাম পড়ে যায়
    • ঋণগ্রহীতারা তাদের ঋণ পরিশোধে হিমশিম খায়
    • জামানতের মূল্য কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে
  3. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ
    • কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ব্যাংক এবং আর্থিক ব্যবস্থাকে সহায়তা করতে নতুন টাকা তৈরি করে
  4. চক্রটি আবার শুরু হয়
    • ঋণ আবার বাড়ে, নতুন এক বুম পর্যায় শুরু হয়
কল্পিত বাইসাইকেল

ধরুন আপনার একটি বাইসাইকেল আছে এবং আপনি সেটি একজন ব্যাংকারকে ধার দিলেন। ব্যাংকার সেটি শুধু ব্যবহার না করে, একই বাইসাইকেল অনেকজনকে একসাথে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করল। প্রত্যেকেই মনে করে, তারা যখন ইচ্ছা তখন বাইসাইকেলটি ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে, বাইসাইকেলটি একটাই। বাকি সব বাইসাইকেল আসলে শুধু প্রতিশ্রুতি।

শুরুর দিকে, সবকিছু ঠিকঠাক মনে হয়। সবাই একসাথে বাইসাইকেল চালাতে চায় না, তাই সবাই ভাবে প্রচুর বাইসাইকেল আছে। এজন্য সবাই আত্মবিশ্বাসী থাকে এবং পরিকল্পনা করতে থাকে।

কিন্তু একদিন, সবাই একসাথে বাইসাইকেল চালাতে চায়। সবাই এসে তাদের বাইসাইকেল চাইতে থাকে, তখনই সমস্যা স্পষ্ট হয়: আসলে বাইসাইকেল একটাই। বেশিরভাগ মানুষ তাদের প্রতিশ্রুত বাইসাইকেল পায় না।

আধুনিক ব্যাংকিংও অনেকটা এভাবেই চলে। ব্যাংকগুলো মানুষের জমা রাখা টাকার খুব অল্প অংশ রেখে বাকি টাকা অন্যদের ঋণ দেয়। এর মানে, ব্যাংকগুলো আসল টাকার চেয়ে অনেক বেশি টাকার দাবি তৈরি করে।

বেশিরভাগ সময় এই ব্যবস্থা চলে, কারণ সবাই একসাথে টাকা তুলতে আসে না। কিন্তু যদি অনেক মানুষ একসাথে টাকা তুলতে আসে, ব্যাংক তখন সব প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারে না। একে বলে ব্যাংক দৌড় (bank run)।

এমন হলে, আর্থিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারাই, যাদের আর্থিক সুরক্ষা সবচেয়ে কম।

কে নিয়ন্ত্রণ করে ফিয়াট ব্যবস্থা?

সরকার

সরকার ফিয়াট নাটকের পরিচালক। কর সংগ্রহের পাশাপাশি, তারা ট্রেজারি কর্তৃক ইস্যু করা নতুন ঋণ (বন্ড) থেকে অর্থ পায়। যখন এই বন্ডের জন্য যথেষ্ট চাহিদা থাকে না, তখন বাকি ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিনে নেয়। এর মানে, সরকার কর বাড়িয়ে জনগণকে ক্ষুব্ধ না করেই খরচ বাড়াতে পারে। এটা সরকারের জন্য ভালো মনে হলেও, সবার জন্য এর মূল্য দিতে হয়: এটা যেন এমন একটি ক্রেডিট কার্ড, যার বিল অন্য কেউ দেয়। সরকারি ঋণ মানে ভবিষ্যতে জনগণের ওপর আরও বেশি কর চাপানোর প্রতিশ্রুতি।

ধনী ব্যক্তিরা

তারা ফিয়াট ব্যবস্থার অনেক সুবিধা পায়। কারণ তাদের সঞ্চয় মূলত সম্পদে রাখা, মুদ্রার (মূল হিসাবের একক) মান কমলেও তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া, তারা তাদের বাড়তে থাকা সম্পদকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে সস্তা ঋণ নিয়ে আরও সম্পদে বিনিয়োগ করে। তারা 'টাকার ছাপাখানার কাছাকাছি' থাকায় মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রভাব তারা খুব একটা টের পায় না।

আর্থিক খাত (ব্যাংকসমূহ)

ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরাসরি ফিয়াট ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে না, কিন্তু তারা এর থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপস্থিতির কারণে, যা পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করে, তারা কার্যত শাস্তিমুক্ত এবং আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অংশিক রিজার্ভ ঋণ প্রদানে উৎসাহিত হয়। এটাই আগেই আলোচনা করা বুম-অ্যান্ড-বাস্ট চক্রের মূল ভিত্তি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক

তারা ফিয়াট ব্যবস্থার অনেক সুবিধা পায়। কারণ তাদের সঞ্চয় মূলত সম্পদে রাখা, মুদ্রার (মূল হিসাবের একক) মান কমলেও তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া, তারা তাদের বাড়তে থাকা সম্পদকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে সস্তা ঋণ নিয়ে আরও সম্পদে বিনিয়োগ করে। তারা 'টাকার ছাপাখানার কাছাকাছি' থাকায় মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রভাব তারা খুব একটা টের পায় না।

তারা কীভাবে লাভবান হয়

এই গোষ্ঠীগুলো বিভিন্নভাবে লাভবান হয়, যার ফলে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের জটিল জাল তৈরি হয়। সরকার সহজে অর্থায়ন পায় এবং দায়িত্বশীল হতে বিলম্ব করে, ধনী ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলো সহজেই মুনাফা করে, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনতার ভান করে পুরো নাটক চালিয়ে যায়। এদিকে, সাধারণ জনগণ এই পুরো ব্যবস্থার বোঝা বহন করে, কারণ তাদের নগদ সঞ্চয় বছর বছর গলে যায়।

শেষ পর্যন্ত, ফিয়াট ব্যবস্থার পুতুলনাটকের পরিচালকরা এমন এক নাটক পরিচালনা করে, যেখানে অল্প কিছু মানুষ অনেক বেশি লাভবান হয়, আর অধিকাংশ মানুষ পিছিয়ে পড়ে ভাবতে থাকে, তারা কবে এগিয়ে যেতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীরবে অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। তাদের আনুষ্ঠানিক কাজ হলো স্থিতিশীলতা ও সততা নিশ্চিত করা, কিন্তু তাদের পদ্ধতিতে আরও অন্ধকার দিক প্রকাশ পায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সরকারগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এবং মুদ্রানীতির সুতো টানে, সুদের হারসহ নানা উপায়ে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। সংকটের সময়, তারা হাওয়ায় টাকা ছাপিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ঢেলে দেয়, যেন সবকিছু ঠিক আছে বলে মনে হয়।

তারা শুধু নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক নয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, খেলার নিয়ম নির্ধারণ করে, এবং যখন তারা সমস্যায় পড়ে তখন শেষ আশ্রয়দাতা হিসেবে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে। এই নিয়ন্ত্রণের জাল, বাহ্যিকভাবে সুরক্ষামূলক মনে হলেও, অর্থনীতি ও ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি তাদের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।

প্রণোদনা তহবিলের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টাকা কোথা থেকে আসে এবং কে কীভাবে তা বণ্টন করবে, তা বোঝা বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারগুলো নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির বিভিন্ন উপায়ে অর্থ সরবরাহ ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) মুদ্রানীতির মাধ্যমে সুদের হার নির্ধারণ করে, যা বাজারে টাকার পরিমাণকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, রাজস্বনীতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলতে ব্যয় ও কর ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত।

টার্গেট রেটস মুদ্রানীতি
  • বেকারত্ব ৬.৫% এর নিচে
  • জিডিপি বার্ষিক ২% - ৩% বৃদ্ধি
  • মূল মুদ্রাস্ফীতি হার ২.০% - ২.৫% এর মধ্যে
সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি
  • ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়িয়ে সামগ্রিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই লক্ষ্য।
  • সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি
  • কর কমানো
সংকোচনমূলক রাজস্বনীতি
  • ভোক্তা ব্যয় ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমিয়ে অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমানো এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি প্রতিরোধ বা হ্রাস করাই লক্ষ্য।
  • সরকারি ব্যয় কমানো
  • কর বৃদ্ধি
টিকতে খুব বড়

“টু বিগ টু ফেইল” বলতে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলো এত বড় এবং পরস্পরের সাথে সংযুক্ত যে, তাদের পতন পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময়, বেশ কয়েকটি বড় ব্যাংককে “টু বিগ টু ফেইল” হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, যার ফলে মার্কিন সরকার হস্তক্ষেপ করে তাদের পতন ঠেকাতে বেইলআউট দেয়।

২০০৮ সালের আর্থিক সংকটে, বিনিয়োগ ব্যাংক Lehman Brothers-এর পতন ডোমিনো প্রভাব সৃষ্টি করে, যার ফলে বিমা জায়ান্ট AIG প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়ে এবং শেয়ারবাজারে ব্যাপক পতন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে হস্তক্ষেপ করে অন্যান্য প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বেইলআউট দিতে হয়, যাতে আরও বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায় এবং বৃহত্তর অর্থনীতিকে রক্ষা করা যায়। এর ফলে “টু বিগ টু ফেইল” ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত Basel III (২০১১)-এর আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নীতিতে G-SIBs: Global Systematically Important Banks-এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হয়।

বিনিময় হার নীতি, সরবরাহ-সংকট এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ অর্থের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার জন্য অতিরিক্ত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও এই নীতিগুলোর উদ্দেশ্য মূলত মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বাস্তবে এই হস্তক্ষেপ প্রায়ই উত্থান-পতনের চক্র সৃষ্টি করে, যা অনেক ব্যবসা এবং বহু পরিবারের সঞ্চয় ধ্বংস করে দেয়।

এই নীতিগুলো কীভাবে কাজ করে তা জানা কেন্দ্রীভূত ফিয়াট মুদ্রা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যতক্ষণ না সমস্যাটি বুঝবেন, ততক্ষণ সমাধানটি চিনতে পারবেন না।

কার্যক্রম: ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং

এটি একটি শ্রেণিকক্ষের অনুশীলন, যেখানে ব্যক্তি ও ব্যাংকের কার্যক্রমের মাধ্যমে ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং-এর ব্যবহার অন্বেষণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সরাসরি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝা, কীভাবে এই পদ্ধতি অর্থের সরবরাহ বাড়ায়।

মূল বিষয়সমূহ
  1. একটি ভগ্নাংশ = সম্পূর্ণের একটি অংশ।
  2. ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ব্যাংকগুলো তাদের হাতে রাখা অর্থের চেয়ে বেশি ঋণ দেয়, অর্থাৎ “রিজার্ভে” রাখা টাকার চেয়ে বেশি।
  3. রিজার্ভের পরিমাণ যত কম, ব্যাংকগুলো তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে—ব্যাংক দৌড় বা দেউলিয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  4. এই পদ্ধতি সাউন্ড মানি (যেমন স্বর্ণ) অথবা আনসাউন্ড মানি (যেমন ফিয়াট) উভয়ের সাথেই ব্যবহার করা যেতে পারে।
  5. অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষমতা, বেইলআউট এবং বীমা কর্মসূচি (যেমন FDIC)-এর সাথে মিলিত হয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। তারা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হয়, কারণ লাভ তারা নিজেরা রাখে, কিন্তু ক্ষতি হয় সবার।
শিক্ষার্থীদের জন্য টিপস

রিজার্ভ ব্যাংকিং বা এর ঝুঁকি বোঝার জন্য আপনাকে গণিত বিশেষজ্ঞ হতে হবে না।

3.3 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা (CBDC) হলো ফিয়াট মুদ্রার পরবর্তী ধাপ। শারীরিক নোট, কয়েন এবং ডিজিটাল পেমেন্টের সংমিশ্রণের পরিবর্তে, CBDC সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল ফিয়াট মুদ্রা, যা সরকার দ্বারা ইস্যু করা হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

আপনি প্রতিদিন যে মুদ্রা ব্যবহার করেন, কল্পনা করুন সেটি কোনো শারীরিক রূপ ছাড়াই — পকেটে ঝনঝন করার মতো কোনো কয়েন নেই, ভাঁজ করার মতো কোনো নোট নেই। CBDC-কে আলাদা করে তোলে সরকারের এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বাড়তি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির সুযোগ। CBDC-এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ আর্থিক লেনদেনে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা পায়, যার ফলে তারা সহজেই অর্থের প্রবাহ ট্র্যাক, নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত করতে পারে।

সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহজেই CBDC-এর রূপ ও সরবরাহ পরিবর্তন করতে পারে, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং আরও নিখুঁতভাবে আর্থিক ও রাজস্ব নীতির বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করতে পারে। মূলত, CBDC কর্তৃপক্ষের জন্য তাদের ফিয়াট মুদ্রা প্রভাবিত ও পরিচালনা করার আরও কার্যকর উপায় প্রদান করে।

যদিও CBDC-কে ফিয়াট অর্থের ভবিষ্যৎ মনে করা হয়, বিশ্বের বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ ফিয়াট মানদণ্ডে চলছে। ফিয়াট মুদ্রা আর স্বর্ণের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, যার ফলে প্রকৃত কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই অর্থের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

↑ সূচিতে ফিরে যান